রাত ৯টায় ভিডিও কল বারবার কেটে যাচ্ছে, অথচ ISP-র বিল ঠিকই আসছে। এমন সময় প্রথমেই নতুন রাউটার কেনার দরকার নেই। আগে বের করুন গতি আটকাচ্ছে কোথায়: ISP-র লাইনে, রাউটারে, নাকি ঘরের ভেতরের বাতাসে, মানে Wi-Fi সিগন্যালে। খোঁজার ক্রমটা নিচে দেওয়া আছে, সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা সবার আগে।

প্রথমে বুঝুন সমস্যাটা কোন তিন জায়গার একটিতে

ইন্টারনেট ধীর মানে একটাই কারণ নয়। গতির পথটা এমন: ISP-র নেটওয়ার্ক, তারপর ONU বা মডেম, তারপর আপনার রাউটার, তারপর বাতাসে Wi-Fi, তারপর আপনার ফোন বা ল্যাপটপ। এর যেকোনো একটি ধাপ সরু হলে পুরো পথ সরু হয়ে যায়। তাই কারণ খুঁজতে হয় পথের মাঝখান থেকে, যেখানে একটা সহজ কাজ আপনাকে দুই ভাগে ভাগ করে দেবে: তার দিয়ে ধীর, না শুধু Wi-Fi-তে ধীর।

তিনটি সহজ যাচাই, দশ মিনিটের মধ্যে

  1. ল্যাপটপ তার দিয়ে লাগান। একটা LAN কেবল দিয়ে ল্যাপটপ সরাসরি রাউটারের LAN পোর্টে দিন, Wi-Fi বন্ধ রাখুন। এবার একই ওয়েবসাইট বা ভিডিও চালিয়ে দেখুন। তারে দ্রুত আর Wi-Fi-তে ধীর হলে সমস্যা Wi-Fi-এর দিকে।
  2. রাউটারের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। রাউটার থেকে এক-দুই মিটারের মধ্যে ফোনে একই কাজ করুন। কাছে ঠিক, দূরে খারাপ হলে সমস্যা সিগন্যাল পৌঁছানোর, রাউটারের গতির নয়।
  3. বাড়ির বাকি ডিভাইস বন্ধ করুন। টিভি বক্স, গেম কনসোল, ফোনের অটো-আপডেট, সবকিছুর Wi-Fi কিছুক্ষণ বন্ধ রেখে আবার মাপুন। হঠাৎ গতি ফিরলে কোনো একটি ডিভাইস লাইন খেয়ে নিচ্ছে।

গতি মাপার সময় Mbps আর MB/s গুলিয়ে ফেলবেন না। ৫০ Mbps লাইনে তাত্ত্বিক সর্বোচ্চ ডাউনলোড মোটামুটি ৬.২৫ MB/s, কারণ ৮ বিটে ১ বাইট। ISP-কে দোষ দেওয়ার আগে নিচের ধাপগুলো পার করুন।

তারেও যদি ধীর হয়

তারে ধীর মানে Wi-Fi-র দোষ নেই। তখন তালিকাটা ছোট:

  • লাইনের গতিই কম। ISP-র প্যাকেজ আর বাস্তব গতি আলাদা হতে পারে। রাতে পাড়ার সবাই একসঙ্গে ব্যবহার করলে ISP-র দিকে চাপ বাড়ে, সেটা আপনার রাউটার বদলে ঠিক হবে না।
  • রাউটার আটকে গেছে। দিনের পর দিন চালু থাকা রাউটার কখনও হ্যাং হয়, রিস্টার্ট করলে ঠিক হয়ে যায়। বারবার ঘটলে আলাদা কারণ খুঁজতে হবে।
  • পোর্টের সীমা। রাউটারের WAN পোর্ট যদি 10/100 Mbps হয়, তাহলে ১০০ Mbps-এর বেশি প্যাকেজ নিলেও সেই রাউটার থেকে পুরোটা পাওয়া যাবে না। TP-Link Archer C54-এর রিভিউতে এই সীমাটা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা আছে।
  • PPPoE বা ক্যাবলের সমস্যা। ভুল পাসওয়ার্ড, ঢিলে প্লাগ বা ভাঙা LAN কেবলেও গতি পড়ে যায়।

তারে ঠিক আছে কিন্তু Wi-Fi-তে খারাপ হলে এবার নিচের তালিকায় যান।

শুধু Wi-Fi ধীর হলে বারোটি কারণ

সম্ভাবনার ক্রমে সাজানো হয়েছে, ওপরের কারণগুলো বেশি দেখা যায়।

  1. রাউটার ভুল জায়গায়। আলমারির ভেতর, টিভির পেছনে, মেঝেতে বা ঘরের এক কোণে রাখলে সিগন্যাল অর্ধেক নষ্ট হয়। ফ্ল্যাটের মাঝামাঝি, উঁচুতে রাখুন।
  2. পুরু দেয়াল ও লিফট-শাফট। কংক্রিট আর স্টিল সিগন্যাল আটকায়। কোন ঘরে সিগন্যাল কতটা, তা নিজে মেপে দেখার পদ্ধতি আলাদা লেখায় থাকবে।
  3. প্রতিবেশীর রাউটার। ঘিঞ্জি ভবনে অনেক রাউটার একই 2.4 GHz চ্যানেলে চলে। 2.4 GHz-এ পরস্পর ওভারল্যাপ করে না এমন চ্যানেল তিনটি: ১, ৬ ও ১১। চ্যানেল বদলের ধাপ আলাদা লেখায় আসছে।
  4. ডিভাইসটি 5 GHz-এ নেই। পুরোনো ফোন বা টিভি শুধু 2.4 GHz চেনে। আবার 5 GHz নাম দেখাই যায় না এমন ঘটনার আলাদা সমাধান আছে।
  5. এক ব্যান্ডে সব ডিভাইস। ফোন, টিভি, ল্যাপটপ আর ক্যামেরা একই 2.4 GHz-এ থাকলে ভিড় হয়। কাছের ডিভাইস 5 GHz-এ সরান।
  6. বাতাসের গতির সর্বোচ্চ সীমা। রাউটারের বাক্সে 300 Mbps লেখা মানে এটাই ব্যান্ডের তাত্ত্বিক সীমা। বাস্তবে একাধিক ডিভাইস ভাগ করে নিলে প্রতিটির ভাগে অনেক কম পড়ে।
  7. টিভি বা TV box-এর স্ট্রিমিং। বাফারিং শুধু গতির নয়, সিগন্যালের স্থিরতার প্রশ্নও। এর আলাদা ধাপ লেখা হচ্ছে।
  8. রাউটার গরম বা হ্যাং। বন্ধ জায়গায় রাখা রাউটার গরম হয়ে ধীর হতে পারে। বারবার রিস্টার্ট হলে আলাদা কারণ আছে।
  9. অ্যান্টেনা ঢিলে বা নিচের দিকে। অ্যান্টেনা সোজা বা হালকা বাঁকিয়ে রাখুন, ভেঙে গেলে মডেলভেদে সমাধান আলাদা।
  10. Wi-Fi যুক্ত আছে, ইন্টারনেট নেই। সিগন্যাল পূর্ণ দেখালেও গেটওয়ে বা DNS-এর সমস্যায় পেজ খোলে না। এটা ধীর নয়, আলাদা সমস্যা।
  11. অচেনা ডিভাইস লাইন খাচ্ছে। পাসওয়ার্ড অনেকে জানলে কেউ বড় ফাইল নামাতে পারে। পাসওয়ার্ড বদলান এবং অতিথির জন্য আলাদা Guest নেটওয়ার্ক দিন।
  12. এক রাউটারে পুরো বাড়ি। ফ্ল্যাট বড় বা দুই তলা হলে একটাই রাউটার যথেষ্ট নয়। পুরোনো রাউটারকে Access Point বানিয়ে দূরের ঘরে সংযোগ দেওয়া যায়।

Wi-Fi ধীর হলে তার ও Wi-Fi আলাদা করে গতি মাপার ধাপের চার্ট

ঢাকার ফ্ল্যাট ও লোডশেডিং: বিশেষ কয়েকটি কথা

অনেক ভবনে এক ফ্লোরে কয়েকটি ফ্ল্যাট পাশাপাশি থাকে, প্রত্যেকের নিজের রাউটার। তাই সন্ধ্যার দিকে 2.4 GHz বেশি ঘিঞ্জি লাগতে পারে। মেপে না দেখে দোষ দেওয়া ঠিক নয়। আর লোডশেডিংয়ের পর বিদ্যুৎ ফিরলে রাউটার, ONU আর ISP-র নিজস্ব ডিভাইস একসঙ্গে চালু হয়। কয়েক মিনিট গতি কম বা সংযোগ অস্থির থাকলে সঙ্গে সঙ্গে রাউটার রিসেট করবেন না। ৩-৫ মিনিট অপেক্ষা করুন, তারপর যাচাই করুন। ISP-র দিকে ব্যাকআপ না থাকলে পুরো এলাকার লাইন বন্ধ থাকতে পারে, সেটা আপনার রাউটারের দোষ নয়।

তিন কামরার ফ্ল্যাটের একটি কাল্পনিক হিসাব

ধরুন রাউটার ড্রয়িং রুমের কোণে, আর আপনি দুটি ঘর পেরিয়ে শোবার ঘরে বসে ভিডিও দেখছেন। ড্রয়িং রুমে তারে গতি ৫০ Mbps এল, শোবার ঘরে Wi-Fi-তে এল ৮ Mbps। এখানে লাইন বা রাউটারের গতি কম নয়, কমে যাচ্ছে মাঝের দুটি দেয়ালে। প্রথম চেষ্টা রাউটারটাকে মাঝের ঘরে বা ফ্ল্যাটের মাঝামাঝি উঁচু জায়গায় সরানো। যদি তা সম্ভব না হয়, তখন পুরোনো রাউটারকে Access Point বানিয়ে শোবার ঘরের কাছে বসান। এই সংখ্যাগুলো উদাহরণ, আপনার ফ্ল্যাটে মেপে দেখতে হবে।

পরীক্ষার ফল লিখে রাখুন

  • তারে ও Wi-Fi-তে মাপা গতি, সময়সহ, আলাদা আলাদা।
  • রাউটারের মডেল, ফার্মওয়্যার সংস্করণ ও ব্যান্ড (2.4 GHz না 5 GHz)।
  • রাউটারের কাছে ও দূরে দুই জায়গার গতি।
  • কোন ডিভাইসগুলো একসঙ্গে চলছিল।

কোন রাউটারে পরিবর্তন লাগবে

উপরের সবকিছু দেখেও যদি বোঝা যায় রাউটারই ছোট পড়ছে, তখন বাছাইয়ের হিসাব শুরু হয় লাইনের গতি, ঘরের আকার আর বাজেট ধরে। একটি ফ্ল্যাটে Wi-Fi কেন দুর্বল হয়, তার বাস্তব উদাহরণ আছে Ruijie RG-EW1300G-এর ফ্ল্যাট রিভিউতে।

কখন ISP-কে ফোন করবেন

  • তার দিয়ে সংযোগ দিয়েও ভোর বা দুপুরের কম ভিড়ের সময় গতি প্যাকেজের চেয়ে অনেক কম থাকলে।
  • রাউটার রিস্টার্ট ও কেবল বদলের পরও একই ফল হলে।
  • সংযোগ দিনে কয়েকবার ওঠানামা করলে এবং রাউটারের লাইট লাল বা নিভে যায়।

ফোনের আগে সময়, কেবল বা Wi-Fi, আর গতির সংখ্যাগুলো লিখে রাখুন। এতে ISP-র সাপোর্ট দ্রুত বুঝতে পারে।

রাউটার বাছতে সমস্যা হলে UNU Technology-র হটলাইন 01340751013।

আরও পড়ুন

সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

রাউটার কি নির্দিষ্ট সময় পরপর রিস্টার্ট দেওয়া উচিত?

এর কোনো বাঁধা নিয়ম নেই। রাউটার হ্যাং হলে বা গতি হঠাৎ পড়ে গেলে রিস্টার্ট করুন, আর বারবার একই সমস্যা হলে কারণ খুঁজুন।

ফোনের মোবাইল ডেটায় ঠিক চলে, কিন্তু Wi-Fi ধীর, এর মানে কী?

এতে বোঝা যায় ফোন ঠিক আছে। সমস্যা ঘরের Wi-Fi সিগন্যালে, রাউটারে বা ISP-র লাইনে, আর ওপরের তিন যাচাই করলে কোনটি তা আলাদা হবে।

কাছের ডিভাইস কি 5 GHz-এ রাখা ভালো?

কাছে থাকলে সাধারণত 5 GHz-এ বেশি গতি পাওয়া যায়, তবে দেয়াল পার হতে 5 GHz দুর্বল। দূরের ঘরের ডিভাইসের জন্য 2.4 GHz বেশি সুবিধার হতে পারে।

speed test-এ প্যাকেজের চেয়ে কম দেখালে কি ISP-র দোষ?

সবসময় নয়। Wi-Fi-তে মাপলে, ডিভাইস দূরে থাকলে বা পোর্ট 10/100 হলে কম দেখাতে পারে। তারে সরাসরি মেপে ISP-কে সংখ্যা দেখান।