রাত দুটোয় ডাউনলোড চলছে, হঠাৎ রাউটারের সব লাইট নিভে আবার জ্বলে উঠল। সকালে একই কাণ্ড, আবার দুপুরে। এমন হলে রাউটার পাল্টানোর আগে একটা ছোট খাতা নিন। কখন হচ্ছে, তা লিখে রাখলে বেশিরভাগ সময় কারণ নিজেই ধরা পড়ে যায়, কারণ কারণগুলো আলাদা আলাদা সময়ের ছাপ রেখে যায়।
রাউটার বন্ধ না হয়ে শুধু ধীর হলে পড়ুন বাসার Wi-Fi ধীর হলে করণীয়। আর যদি সত্যিই রিস্টার্ট বা হ্যাং হয়, তাহলে নিচে ছক ধরে এগোন। TP-Link-এর সাপোর্ট পাতায় রিস্টার্টের পাঁচটি কারণের কথা বলা আছে: বিদ্যুতের সকেট, অ্যাডাপ্টার, গরম, শিডিউল করা Auto Reboot আর পুরোনো ফার্মওয়্যার। আমরা সেগুলোই আপনার সময়ের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখব।
হ্যাং আর রিস্টার্টের পার্থক্য
শুরুতেই একটা কথা মাথায় রাখুন: সব রিস্টার্ট খারাপ নয়। কিছু রাউটার ফার্মওয়্যার আপডেটের পর বা সেটিং বদলের পর নিজে একবার রিস্টার্ট হয়। সমস্যা তখনই, যখন কোনো কারণ ছাড়া বারবার হচ্ছে।
দুটো আলাদা সমস্যা, আর সমাধানও আলাদা। রিস্টার্টে লাইটগুলো নিভে আবার জ্বলে, ফলে সব ডিভাইসের সংযোগ কেটে যায়। হ্যাংয়ে লাইট জ্বলে থাকে, কিন্তু Wi-Fi নামটা আছে অথচ কিছুই চলছে না, আর প্লাগ খুলে লাগালে ঠিক হয়। রিস্টার্ট সাধারণত বিদ্যুৎ, গরম বা শিডিউলের সঙ্গে জড়িত। হ্যাং প্রায়ই একসঙ্গে অনেক ডিভাইস বা পুরোনো ফার্মওয়্যারের সঙ্গে। কোনটি আপনার ক্ষেত্রে, তা আগে ঠিক করে নিন।
খাতায় সময় লিখুন, তারপর ছকে মেলান
তিন-চার দিন প্রতিবার ঘটনার সময় আর সেই মুহূর্তে কী ঘটছিল লিখে রাখুন। তারপর এই ছকের সঙ্গে মেলান।
| কখন হচ্ছে | সম্ভাব্য কারণ | প্রথম পদক্ষেপ |
|---|---|---|
| রোজ একই সময়ে, যেমন ভোর ৪টায় | শিডিউল করা Auto Reboot | রাউটারের সময়সূচি দেখুন |
| বিদ্যুৎ ওঠানামা বা এলে-গেলে | সকেট বা বিদ্যুতের সমস্যা | অন্য সকেটে বা স্থির লাইনে লাগান |
| দুপুরে গরমের সময় বেশি | তাপ জমা | খোলা, বাতাসওয়ালা জায়গায় সরান |
| অনেকে একসঙ্গে ব্যবহার করলে | ডিভাইসের ভিড়, পুরোনো ফার্মওয়্যার | ফার্মওয়্যার ও সংযুক্ত ডিভাইস দেখুন |
| অ্যাডাপ্টার নাড়ালে | আলগা প্লাগ বা ক্ষয়ে যাওয়া অ্যাডাপ্টার | আসল অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করুন |
খাতায় কী লিখবেন, তার একটা নমুনা: তারিখ ও সময়, তখন ঘরে বিদ্যুৎ ছিল কি না, ক্যামেরা বা টিভি বক্স কয়টি ডিভাইস চলছিল, ঘরটা কেমন গরম ছিল, আর রিস্টার্টের পর রাউটারের কোন লাইট আগে জ্বলল। শেষ তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সব লাইট একসঙ্গে নিভে গিয়ে জ্বলে উঠলে সাধারণত বিদ্যুতের সংযোগ কেটেছে। লাইট নিভে না গিয়ে শুধু ইন্টারনেট লাইটটি বদলালে সমস্যা লাইনে, রাউটার রিস্টার্ট হয়নি, শুধু নেট কেটেছে।
পাওয়ার অ্যাডাপ্টার আর সকেট
অস্থির সকেট বা বিদ্যুতের ঝটকা বারবার রিস্টার্টের কারণ হতে পারে, তাই প্রথমেই অন্য একটি সকেটে রাউটার লাগিয়ে দেখুন। দ্বিতীয়ত, বাক্সের আসল অ্যাডাপ্টারই ব্যবহার করুন। বদলি অ্যাডাপ্টার নিলে রাউটারের লেবেলে লেখা ভোল্ট আর অ্যাম্পিয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে, নইলে রাউটার অস্থির চলবে।
আপনি যদি Tenda AC7 বা IMOU HR12F-এর মতো রাউটার চালান, তবে প্রতিটি মডেলের লেবেল আলাদা হতে পারে, তাই নিজের রাউটারের নিচের স্টিকারটি পড়ুন। অ্যাডাপ্টারের প্লাগের মাথা ঢিলে হলেও নড়াচড়ায় বিদ্যুৎ কেটে রাউটার রিস্টার্ট হয়। আঙুল দিয়ে আলতো নেড়ে দেখুন, নড়াচড়ায় লাইট কাঁপে কি না।

লোডশেডিং ও বিদ্যুতের ওঠানামা
বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার সময় রাউটার প্রতিবার রিস্টার্ট হওয়াটা বাংলাদেশের বহু বাসাতেই চেনা দৃশ্য। এটা রাউটারের ত্রুটি নাও হতে পারে। বিদ্যুৎ ফিরে আসার মুহূর্তে লাইনে ওঠানামা থাকে, সঙ্গে রাউটার বন্ধ থেকে চালু হতে সময় নেয়। ছোট একটি মিনি UPS এই ঝামেলা কমাতে পারে। সেটি বসানোর আগে ভোল্ট মেলানোর ধাপগুলো আছে রাউটার ও ONU-র ভোল্ট মিলিয়ে মিনি UPS লাগানোর লেখায়। যে কোনো UPS বা অ্যাডাপ্টারের ক্ষেত্রে নিজে খুলবেন না, আর প্রস্তুতকারকের ম্যানুয়াল দেখে সংযোগ দিন।
এর পাশাপাশি একটি সহজ পরীক্ষা করা যায়। রাউটারের সকেট থেকে অন্য বাতি বা পাখার সংযোগ আলাদা করে দিন, যাতে ভারী যন্ত্র একই এক্সটেনশন বোর্ডে না থাকে। ফ্রিজ, মোটর বা এসি চালু হওয়ার সময় লাইনে সামান্য ধাক্কা লাগে, আর একই বোর্ডে থাকা রাউটার তা টের পায়। রাউটারকে আলাদা সকেটে নিয়ে গিয়ে কয়েক দিন দেখুন, রিস্টার্টের হার কমে কি না।
গরম আর জায়গা
গরম একটি সাধারণ কারণ যার জন্য রাউটার নিজে নিজে রিস্টার্ট হয়। রাউটার আলমারির ভেতর, টিভির পেছনে বা অন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের গা ঘেঁষে রাখলে বাতাস চলাচল কমে যায়। চেষ্টা করুন: খোলা তাকে রাখুন, তার ওপর কিছু চাপাবেন না, আর সরাসরি রোদের জায়গা এড়িয়ে চলুন। ভেন্টের ফাঁকে ধুলো জমলে শুকনো নরম কাপড়ে আলতো মুছে নিন।
একসঙ্গে অনেক ডিভাইস যুক্ত থাকলেও রাউটারের ওপর চাপ পড়ে। বাসায় যদি ফোন, টিভি, ক্যামেরা ও আরও কিছু ডিভাইস একই সময়ে চলে, তখন পুরোনো বা ছোট রাউটার হ্যাং করতে পারে। কিছুক্ষণ কয়েকটি ডিভাইস বন্ধ রেখে দেখুন, হ্যাং কমে কি না। কমলে সমস্যা রাউটারের সামর্থ্যের, তখন বড় বাসার জন্য উপযুক্ত মডেলের কথা ভাবতে হবে।
Auto Reboot আর ফার্মওয়্যার
অনেকে জানেনই না, কিছু রাউটারে শিডিউল করা Auto Reboot থাকে, যা ডিফল্টেই চালু থাকতে পারে। TP-Link রাউটারে এটি System Tools-এর Reboot অংশে থাকে আর তা বন্ধ বা সময় বদল করা যায়। অন্য ব্র্যান্ডে মেনুর নাম আলাদা, তবে ঘুরে দেখলে "Reboot", "Schedule" বা "Maintenance" জাতীয় নাম পাবেন।
ফার্মওয়্যারে ত্রুটি থাকলেও রিস্টার্ট লুপ হতে পারে। আপডেট দেওয়ার আগে কী করবেন, কী করবেন না, তা আছে ফার্মওয়্যার আপডেটের লেখায়। আপডেটের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে রাউটার নষ্ট হতে পারে, তাই স্থির বিদ্যুতের সময় বেছে নিন।
সব চেষ্টা করেও না থামলে
ফ্যাক্টরি রিসেট করে দেখুন, আর তাতেও না হলে প্রস্তুতকারকের সাপোর্টে যোগাযোগ করুন। রিসেটের আগে ISP-র ইউজারনেম-পাসওয়ার্ড বা PPPoE তথ্য লিখে রাখুন, কারণ রিসেটে তা মুছে যায়। এরপরও রিস্টার্ট চলতে থাকলে সম্ভবত হার্ডওয়্যারের ত্রুটি, তখন ওয়ারেন্টি দাবির কথা ভাবুন।
ISP-কে জানানোর সময় বলুন, রাউটার রিস্টার্ট হচ্ছে নাকি শুধু ইন্টারনেট কাটছে। দুটো আলাদা ঘটনা, আর খাতার সময়গুলো দেখালে ISP-র কর্মী দ্রুত বুঝবে লাইনের দিকে সন্দেহ করবে নাকি আপনার ঘরের দিকে। যদি রিস্টার্টের সময় ONU-র লাইটও নিভে যায়, তাহলে বিদ্যুতের সংযোগ দুটোতেই একসঙ্গে কাটছে, এটা ছোট সূত্র।
অন্য রাউটারে একই সমস্যা হয় কি না, সেটি আরেকটি পরীক্ষা: ধার করা একটি রাউটার একই সকেটে একই অ্যাডাপ্টারে কয়েক দিন চালিয়ে দেখুন। সেটিও রিস্টার্ট হলে দোষ বিদ্যুতের, রাউটারের নয়। নতুন রাউটার লাগলে UNU Technology-র 01340751013 নম্বরে জানতে পারেন।
সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
রাউটার কি সারাক্ষণ চালু রাখা উচিত?
অনেক বাসাতেই রাউটার সারাক্ষণ চালু থাকে। নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ করার কোনো নিয়ম আপনার মডেলের ম্যানুয়ালে থাকলে সেটাই দেখুন।
অন্য কোম্পানির অ্যাডাপ্টার লাগালে কী হয়?
ভোল্ট বা অ্যাম্পিয়ার না মিললে রাউটার অস্থির হতে পারে। অ্যাডাপ্টারের আউটপুট রাউটারের লেবেলের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
রাউটার গরম হওয়া কি স্বাভাবিক?
সামান্য গরম হতে পারে। কিন্তু হাতে ধরা না যায় বা বারবার বন্ধ হয়, তাহলে বাতাস চলাচলের জায়গায় সরান এবং ম্যানুয়াল দেখুন।
রিসেট করলে কি রিস্টার্ট থামে?
কখনও কখনও নষ্ট সেটিং মুছে গেলে থামে, কিন্তু রিসেটে ISP-র তথ্যও মুছে যায়। আগে ইউজারনেম-পাসওয়ার্ড লিখে রাখুন।
